
জমির মালিকানা পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম নথিভুক্ত করতে নামজারি বা মিউটেশন করা বাধ্যতামূলক। সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন নিয়মে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে জমি ভাগ-বাটোয়ারা না হলে ওয়ারিশদের আলাদা খতিয়ান করা যাবে না। একই খতিয়ানে সব ওয়ারিশের নাম যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে আলাদা কোনো বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন হবে না। ওয়ারিশ সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ভিত্তিতেই সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে তোলা যাবে। তবে কেউ যদি নিজের অংশ অনুযায়ী আলাদা খতিয়ান করতে চান কিংবা পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ পরিবর্তনের কথা বলা হয়। এর ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে ‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’ নীতি কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবেদনের সময় সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। কোনো ওয়ারিশ বাদ পড়লে আবেদন নামঞ্জুর হতে পারে।
তবে শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না। ওয়ারিশ সনদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
পৃথক খতিয়ান করতে হলে ওয়ারিশদের নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ-বাটোয়ারা করে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হবে। এরপর সেই দলিলের ভিত্তিতে প্রত্যেক ওয়ারিশের নামে আলাদা খতিয়ান করা যাবে। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে এখন মূলত দুটি পথ রয়েছে—সব ওয়ারিশের যৌথ নামে একটি খতিয়ান অথবা নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক খতিয়ান।
নতুন নিয়মে নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া জমি কেনাবেচা, দান বা হেবা করা যাবে না। দলিল নিবন্ধনের সময় নামজারির খতিয়ান দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে আগে থেকেই কারও নামে নামজারি সম্পন্ন হয়ে থাকলে এবং রেকর্ড সঠিক থাকলে নতুন করে নামজারি করার প্রয়োজন নেই।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে নামজারির আবেদন করা যায়। নির্ধারিত ফি দিয়ে সাধারণত ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির লক্ষ্য রয়েছে। নামজারির জন্য দলিল বা রেজিস্ট্রি দলিল, আগের খতিয়ানের কপি ও দাগ নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র, উত্তরাধিকারসূত্রে হলে ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যুসনদ এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের রসিদ প্রয়োজন হতে পারে। কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে বা জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে বেশি সময় লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়মে একজন ওয়ারিশের পক্ষে এককভাবে পুরো সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার সুযোগ কমবে, সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ হবে এবং জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমা কমতে পারে। একই সঙ্গে নারী ওয়ারিশদের অধিকারও আরও সুরক্ষিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পরিবারের কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে বা তার সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে সবার কাগজপত্র একসঙ্গে সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। আবার পৃথক খতিয়ানের জন্য নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করতে ভূমি অফিসের জনবল বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূমি আইনজীবীদের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন নিয়মটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞরা জমি কেনার পর দলিল রেজিস্ট্রির ৯০ দিনের মধ্যে নামজারির আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন। আর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রথমে যৌথ নামজারি এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তীতে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে আলাদা খতিয়ান করার পরামর্শ দিয়েছেন।